Skip to main content

পুরুষ নির্যাতনের ছোটছোট গল্প নিয়ে উপন্যাস -- ♥♣নিরুপায় পুরুষ♦♠. মেহেদী হাসান তামিম


★পুরুষ নির্যাতনের ছোটছোট গল্প নিয়ে উপন্যাস★

পাঠকের বিপুল উৎসাহ আর আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে উপন্যাসটির প্রথম কয়েকটি পর্ব প্রকাশ করা হলো।

"পুরুষ নির্যাতন" এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে পাঠকের মন্তব্য অতি গুরুত্বের সাথে গ্রহন করা হবে এবং প্রয়োজনে তা উপন্নাসে সন্নিবেশিত হবে।
আশা করছি পুরুষ নির্যাতন উপন্যাসটি পাঠকের আগ্রহ ও ভালোবাসা কুঁড়াবে। সাথেই থাকুন, চলুন পাঠক আর লেখকের সম্মিলিত প্রায়াসে লিখা হোক " পুরুষ নির্যাতন" নামক সুবিশাল এই উপন্যাস। আরো একটি বিশেষ কথা যে কেউ, যেকোন পাঠক উপন্যাসের ধরাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন যে কোন চ্যাপ্টার , অধ্যায়, প্যারা প্রবেশ করাতে পারবেন এবং তাঁর নামও লেখক হিসেবে এই উপন্যাসে উল্লেখ করা থাকবে। চলুন শুরু করি আমাদের প্রজেক্ট : লেখকের সাথে পাঠক।
(পুরুষের জন্য লিখা মানেই নারীবিরোধী না। নারীদের প্রতি শতভাগ সম্মান আমার ছিল, আছে, থাকবে। নারীদের জন্য তো আমরা সবাই আছি, আইন আছে, সরকার আছে। কিন্তু পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতিত হচ্ছে। তাদের আসলেই দাঁড়াবার কোথাও কোন জায়গা নেই। আশেপাশে ঘটে চলা এই ঘটনাগুলো আমি আমার নতুন উপন্যাস "নিরুপায় পুরুষ" এ তুলে ধরতে চাই
আমাদের আশেপাশে পুরুষ নির্যাতন ঘটছে প্রতিদিন। আমনার নিজের সাথে ঘটা, অথবা অন্য কারো সাথে ঘটতে দেখা পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা জানা থাকলে নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে আমাকে ইনবক্সে ঘটনাটি লিখে পাঠান। বিস্তারিত না হলেও চলবে। আপনি চাইলে নাম পরিচয় শতভাগ গোপন রাখা হবে। অথবা মেইল করতে পারেন mehedi27batch@gmail.com

পর্ব - এক.
পুরুষদের নিয়ে কথা বলবার সময় এসে গিয়েছে। কেউ পুরুষের জন্য, পুরুষের পক্ষে কখনো কোন কথা বলছে না। আপনারা কি ভাবেন, পুরুষরা নির্যাতিত হয় না! আমাদের এই সমাজে অনেক পুরুষ আছে যারা তার পরিবার দ্বারা, নিজের বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি দ্বারা প্রতিনিয়ত নিগ্রহিত হয়ে চলেছে। কিন্তু তাদের যাবার কোন জায়গা নেই।দেশের প্রচলিত আইনগুলো একটিও পুরুষের পক্ষে নয়। যত দোষ নন্দ ঘোষ। ঘটনা যাই ঘটুক কোন বিশ্লেষণ ছাড়াই দোষী সাব্যস্ত হয় পুরুষ। বিচার মানি তালগাছ আমার। অপরাধ পুরুষের।
কিছুদিন আগে এক ছোটভাই ইংল্যান্ড থেকে ফেন দিয়ে জানালো, তার বউ আর শাশুড়ি দুজনে মিলে তাকে মেরে রক্তাক্ত করে পরের ফ্লাইটে দেশে চলে এসেছে। ভাইবারে সে রক্তাক্ত ছবিও সে পাঠিয়েছে- যা আমার কাছে রক্ষিত আছে। তাদের মূল সমস্যা হলো ছোট বাড়ী যার কিনা টয়লেট একটাই। সে টয়লেটে জামাইও ইয়ে করবে শাশুড়িও ইয়ে করবে তা কি হয়! সাতদিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল বাড়ী পাল্টানোর জন্য। বেচারা চেষ্টা করেছে সাধ্যমতো। কিন্তু সাতদিনের ভেতরে সে বাড়ী ভাড়া নিতে পারেনি। তাই তার এ বেহাল দশা। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল তার এখন কি করার আছে। এব্যাপারে আমার জ্ঞান নিতান্ত সীমিত, তাই সেদিন চেপে গিয়েছিলাম।
এক প্রতিবেশীর সাথে লিফটে দেখা। বেশ বিনয়ী আর ভদ্র মানুষ। আমি তার উপরতলার বাসিন্দা হওয়ায় প্রায়ই দেখতাম সে ভাবী লিফটে কল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লিফটের দরজা খোলামাত্র সেই ভদ্রার্জুন
এমন মনমরা হয়ে লিফটে উঠতেন যেন বউকে ফেলে অফিসে যেতে তার দারুণ কষ্ট হচ্ছে। ভাবীও কি হাসিমুখে দাড়িয়ে মিষ্টিমিষ্টি মুখে আলতো হাত তুলে বিদায় দিচ্ছে। এইদৃশ্য প্রতিদিন দেখি আর ভাবি এলোকের কি কপাল, ভাবী একেবারে লিফট পর্যন্ত এসে বিদায় জানান, আর আমার বৌ মূল ফটকের চৌকাঠ পর্যন্ত। অবশ্য তাতে কোনদিন আমার কোন খারাপ লাগা কখনো কাজ করেনা।
যাই হোক বউয়ের কাছে বিদায় নিয়ে লিফ্টের দরজা বন্ধ হতেই সেই ভদ্রলোক তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করলেন, ভাই শুনেছি আপনি লেখেন টেখেন। আমি কিছু সমস্যায় আছি, আমার এই গল্পটা লিখে দেন না। আমি বললাম ঠিক আছে আপনার কথা শুনব। অফিস থেকে ফিরে আপনার বাসায় আসব। উনি যেন আঁৎকে উঠলেন, বললেন ভাই আমাদের বাসার উল্টোদিকে যে রেষ্টুরেন্টটা সেখানে দয়া করে আসুন না সন্ধ্যায়। আমি বললাম আসব।
আমি লিফট থেকে অফিসে পিক আপ, আর ড্রপ সার্ভিসের গাড়ীর জন্য দাঁড়ালাম। বর ভাবতে লাগলাম, সে ভদ্রলোকের কিইবা সমস্যা হতে পারে। দূরে অফিসের মাইক্রো বাস দেখা যাচ্ছে। উঠতে হবে এখনই।

পর্ব - দুই.
অফিস থেকে বের হবার কথা ৫ টায়। বেরুলাম ৬ টায়। এ এক নতুন জ্বালা শুরু হয়েছে। ৫ টায় বেরুলে বাসা ফিরতে সময় লাগে দুই ঘন্টা আর ৬টায় বেরুলে এক ঘন্টা। কাজেই কাজ না থাকলে ডেস্কে বসে কিছু পড়ার, লিখার,চিন্তা করার চেষ্টা করি। ভাবছিলাম সেই লোক ( আসলে তার নামটা আমার জানা নেই, বাস্তবতা এটাই মানুষ তার নিজের বাহিরে কাউকে নিয়ে এখন আট ভাবে না, প্রতিবেশীর নামটা জানা না জানা কোন বিষয় নয় এখানে) কি বলতে পারে। আবার টাকা ধার টার চাইবে নাতো! বুক দুরুদুরু করে উঠল।
যাইহোক অফিসের বাস যখন মিস করেছি ৩ নং পাবলিক বাসই ভরাসা। জসীমউদ্দীনের মোড়ে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দাঁড়ানোর মতো একটা জায়গা আছে এমন একটা বাসে উঠলাম। আশেপাশে উৎকট ঘামের গন্ধ, গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি এখন আর সমস্যা হয় না। এয়ারপোর্ট গিয়ে গাড়ি থামলো। একটা লোকও বাস থেকে নামল না অথচ অসংখ্য মানুষ ভ্রমরের গুঞ্জন তুলে বাসে উঠল। এর মধ্যে কয়েকজন মহিলাকেও দেখলাম ঠেলাঠেলি করে পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাসে উঠলেন। মনে মনে ভাবলাম সেই দিন আার নাই, এইযে গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন- বাড়ীতে কি মা বোন নেই। যাইহোক প্যাসেঞ্জার রা ইতোমধ্যে চেঁচানো শুরু করেছে, ওই হাউয়ার পোলারা যা, যা গিয়া বাড়ী থাইকা প্যাসেঞ্জার ধইরা নিয়ায়। তারা যেসব গালি দিয়ে চেঁচাচ্ছেন তার মধ্যে সর্বোচ্চ ভদ্রস্থ গালিটার কথা উল্লেখ করলাম।
যে মহিলারা হুরমুড়িয়ে বাসে উঠেছিল তারা বসার কোন জায়গাই পেল না। তারাও পুরুদদের সাথে একই কাতারে রড ধরে ঝুলে থাকল। তাদের জন্য সত্যিই খুব মায়া হচ্ছিল। স্টুডেন্ট গোছের এক ছেলে তার সিট থেকে উঠে একজন মহিলাকে বসার জায়গা লরে দিল।
ভালো লাগল বেশ। সমাজ থেকে কিছু কিছু মানুষের মূল্যবোধ এখনও উঠে যায়নি তবে। দাঁড়িয়ে থেকে বাসে রড ধরে হাল্কা ঘুমিয়ে নেয়াটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই রপ্ত করেছিলাম। তাই সময়টা কাজে লাগাতে রড ধরেই একটা বাসঘুম দেয়ার চেষ্টা করলাম। আচ্ছা বাসঘুম শব্দটা হয়তো আপনাদের পরিচিত নাও হতে পারে। ভার্সিটিতে পড়ার সময় এ ঘুম আমিই আবিষ্কার এবং সংজ্ঞায়ন করেছিলাম। বাসের দুলুনির সাথে তাল মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রড ধরে অথবা পাশে বসা মানুষটির কাঁধে মাথা দিয়ে, পাশের বসা লোকটি যদি নিজেও ঘুমায় সেটা সর্বোত্তম, আর যদি উনি না ঘুমায় তাহলে প্রথমে কিছু না করেই একটু চেপে বসার চেষ্টা করবেন, তারপরও কাজ না হলে জোরে জোরে একটু গলা খাকাড়ি দিবে যাতে পাশে ঘুমানো লোকটির ঘুম ভাঙ্গে। এতেও কাজ না হলে বিরক্তির সাথে বারবার মাথাটি ঠেলে সরিয়ে দেবেন, আর আশেপাশে আড়চোখে দেখবেন কেউ দেখছে নাকি। কারো সাথে চোখে চোখ পড়লে একটি আমতাআমতা করে বাসহাসি ( বাসঘুমের মতোই) হাসবেন। তারপর সামনে কোন সিট খালি হলে আগে সেখানে নিজের হাতের চাবির গোছাটা সেখানে ছুঁড়ে জায়গাটা বুক করে ফেলবেন। তারপর সেখান থেকে তড়িঘড়ি করে সেখানে যেয়ে বসার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তার আগেই কোন ঘাউরা প্রকৃতির লোক সেখানে দুম করে বসে পড়েন তখন শুরু হবে একটা অনাহুত হাউকাউ। এরও একটা নাম আছে বাহাসকাউ। ডিকশনারিতে খুঁজতে যাবেননা। এটাও আমারি দেয়া। সবাই যে সেই পাশে বসা লোকটির মতো হয় তাও কিন্তু না। অনেকে আছেন ঘুমন্ত মানুষটির মাথাটি পরম যত্ন, পরম মমতায় নিজ কাঁধে রাখার সুযোগ করে দিব্যি ভাইটিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখবেন। অনেক ক্ষেত্রে টু শব্দ বা সামান্য নড়াচড়াও করবেন না যাতে ভাইটির ঘুমের কোন ব্যাঘাত ঘটে।
যাই হোক যেখানে ছিলাম রড ধরে ঝুলাঘুম দিতে যাব সে মুহূর্তে বাসের সামনের দিক থেকে একটা হোহো একটা রব উঠল। পায়ের তালুর উপরে যতটা সম্ভব ভর দিয়ে জিরাফের মতো মাথা উঁচু করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। শুধু আমি না, মনে হলো বাসে দাঁড়ানো প্রত্যেকেই জিরাফের আাকার ধারণ করল। এর মাঝেই যতটা সম্ভব উঁকিঝুকি দিয়ে ব্যাপারটা আঁচ করলাম যে এক মহিলা চিৎকার করে বলছেন, ঘরে তোর মা বোন নাই। যাকে বলছিল সেই ছেলেটা একটু আগে যে তার সিটটা ছেড়ে দিয়েছিল। সে বলার চেষ্টা করছে আমি ইচ্ছা করে করিনি আপা, ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষাতেই আপনার উপর পড়ে গিয়েছি। মহিলা কোন কথাই শুনতে রাজী নয়। আমার পাছায় তুই বেটা লুইচ্চা ইচ্ছা করেই হাত দিছিস। বলেই সজোরে একটা চড় বসালো ছেলেটার গালে। ছেলেটা আর কিছুই বলল না, শুধু মাথা নিচু করে পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকল বলে মনে হলো। এদিকে বাসের সবাই মহিলার পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে। দেশটা উচ্ছন্নে গ্যাছে, এখনকার ছেলেপেলেরা সব চরিত্রহীন, মহিলাদের তো নয়ই, মুরব্বীদেরও সম্মান দেয়না, সব কয়টা এক একটা আস্ত বেয়াদব ইত্যাদি। এরই মধ্যে বাসটি আমার কাংখিত স্টপেজে এসে পৌঁছল। আমিও কোনভাবে সব লোকের ভিড় এড়িয়ে, বিশেষ করে সে মহিলার পাশ দিয়ে বের হবার সময় শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। আর আঁড়চোখে দেখার চেষ্টা করলাম সে মহিলার সেই পাছা যার জন্য সেই নিরীহ ছেলেটা যে কিনা কিছুক্ষণ আগেও সম্মান দেখিয়ে একজন মহিলাকে তার সিটটি ছেড়ে দিয়েছিল।
বাস থেকে নেমেই মনে হলো বাসায় গিয়ে আর কোন কাজ নাই,বরং আমার নীচ তলাী ভদ্রলোকটি এতোক্ষণে নিশ্চয়ই সেই রেষ্টুরেন্টে গিয়ে আমার অপেক্ষায় বস আছে। আমি সেই রেষ্টুরেন্টের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

পর্ব - তিন.
রেষ্টুরেন্টে ঢুকতেই দূর থেকে দেখলাম সেই ভদ্রলোক একটা টেবিলে একা বসা। তার অস্থিরতাই বলে দিচ্ছিল উনি কারো জন্যে ব্যকুল হয়ে অপেক্ষা করছে। বেচারার জন্য একটু খারাপই লাগল। আসার কথা ৭ টায় আর এখন ৭.৪৫। ঢাকা শহরে রাস্তাঘাটে যানজটের যে অবস্থা তাতে আসলে কাউকে কোন কথা দিয়ে সেটা রক্ষা করা ভীষণ রকম রিস্কি একটা ব্যাপার। তবে আমার মনে হলো ভদ্রলোক আমার ব্যাপারটা বুঝবেন।
কাছে এগিয়ে যাওয়ামাত্র তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বোকাবোকা একটা হাসি দিলেন। আমি সরি বলার আগেই ভদ্রলোক বললেন, রাস্তায় আজকে যে জট আমি ভেবেছি আপনার আরো ঘন্টাখানিক দেরী হবে। ভীষণ ভাল লাগল, লোকটি আমাকে বিব্রত হওয়া থেকে নিমিষে মুক্তি দিয়ে দিলেন। প্রকৃত ভদ্রলোকরা মনে হয় উনার মতোই হয়, কাউকে বিব্রত করেনা। মনে হলো, লোকটার কথা গভীর মনোযোগ দিয়েই শুনতে হবে। চেয়ারে বসতেই জিজ্ঞেস করলেন, কি অর্ডার করব। আমার যদিও বাসের ঝাঁকুনীতে পেটে থাকা সব কিছু প্রায় হজম হয়ে গিয়েছিল তবুও ভদ্রতা দোখিয়ে বললাম, চা- কফি কিছু একটা হলেই চলবে। তিনি মাথা ঝাঁকালেন, না ভাই তা কি করে হয়, এদের আফগানী কাবাবটা বেশ ভালো হয়, চলেন সেটাি ট্রাই করে দেখা যাক। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, No Problem. উনি ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার করতেই আমি বললাম,
- ভাই আসলে আপনার নামটা মনে করতে পারছিনা।
- ব্রাদার এটাই তো স্বাভাবিক, লিফ্টে হায়, হেলো ছাড়া কোন কথা তো হয়নি আর যে ব্যস্ত সময় সকলের খোঁজ রাখাই তো কঠিন। আমি মোখলেছুর রহমান। আমার বন্ধুরা আমাকে মোখলেছ বলে ডাকে, আপনিও তাই ডাকবেন। সাহেব - টাহেব এ আমি অতোটা স্বস্তি বোধ করিনা। আমার নিজের তৈরী একটা ব্যবসা আছে। বিভিন্ন জায়গায় সিকিউরিটি, নাইটগার্ড, ক্লিনার্স সাপ্লাই দেই। আর এর থেকে যে কমিশন পাই আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো। মোটামুটি এই হলো আমার পরিচয়।
- আমি তৈমুর....
- ভাই আপমার পরিচয় দিতে হবে না। এদেশে খুব কম মানুষই আছে যারা বিখ্যাত লেখক তৈমুর হাসানকে চিনে না।দেশের দশজন লেখকের নাম বলতে বলা হলে আপনারটা নিশ্চিতভাবে প্রথম পাঁচজনের মধ্যেই সবাই বলবে।
- মোখলেছ ভাই যথেষ্ট হইছে। আর আকাশে তুইলেন না, পরে কিনতু নামতে সমস্যা হবে।
বলতে বলতে ধোঁয়া উঠা সুগন্ধিময় আফগানী কাবাব এলো সাথে বসনিয়ান পরোটা। মনে মনে ভাবছি পরোটার অর্ডার আবার কখন দিল নাকি এই কাবাবের সাথে পরোটাটা কমপ্লিমেন্টারি।
- মোখলেছ ভাই সকালে কিজানি কি বলবেন বলেছিলেন? তো ঘটনাটা কি?
- ভাই, খাবারটা শুরু করেন, খেতে খেতে বলছি। এই খাবার গরম গরম না খেলে টেস্টটাই নষ্ট হয়ে যায়।
- মোখলেছ সাহেব শুরু করলে আমিও খেতে শুরু করলাম।
কিন্তু তিনি কোন কথা বলছেন না বা বলার চেষ্টাও করছেন না। অথবা ইচ্ছা থাকলেও বলতে পারছেন না।
আমি তাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলাম। তিনি যে খাচ্ছেন তাও কিন্তু না। শুধু মাথানিচু করে খাবারের প্লেটের আফগানী কাবাব নাড়াচড়াই করে যাচ্ছে, যেন এই কাবাবের ইতিহাস অথবা ঐতিহ্য গভীর মনোসংযোগের সাথে বোঝার চেষ্টা করছেন। আমার মনে হলো সমস্যা গুরুতর। ভয়ানক গুরুতর।

পর্ব - চার
মোখলেেছ সাহেব কথা বলতে শুরু করেছেন। প্লেটের কাবাব রুটি যে অবস্থায় এসেছিল প্রায় সে ভাবেই পড়ে রয়েছে। তার জন্য আমিও ঠিকভাবে খেতে পারলাম না। সামনে একজন না খেয়ে খাবার শুধু নাড়াচাড়া করবেন আর অপর পাশে বসা মানুষটি গোগ্রাসে গিলে চলবেন এটি নিশ্চয়ই শোভনীয় নয়।
মোখলেছ সাহেব বললেন, ভাই আমার যে সমস্যা তা কারো সাথে শেয়ার করতে পারছিনা। অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করেছি আপনি লেখক মানুষ আপনার সাথে কথাগুলো শেয়ার করি, পরামর্শ না দিতে না পারলে অন্তত কোথাও হলেও ব্যাপারটি লিখবেন ভাই। সমাজের মানুষগুলো অন্তত কিছু বিষয় জানার অধিকার তো আছেই।
- জি মোকলেছ ভাই, আপনি বলেন আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব।
- তৈমুর ভাই, ব্যাপারটা হলো একটা সন্তান। আমি একটা সন্তান চাই ভাই।
মনে মনে ভাবলাম, সন্তান চান ভালো কথা, এর মধ্যে আমি কি করব। তিনি নিরস বদনে বলছেন,
- ভাই আমাদের বিয়ে হলো প্রায় বারো বছর। আমার স্ত্রী আমারই ক্লাসমেট ছিল জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে। অতএব বুঝতেই পারছেন আমার বয়স ৩৭ হলে তারও তাই।
- জি ভাই বুঝলাম। তো সন্তান নিয়ে নিলেই তো পারেন।
- ভাই সমস্যাটা তো সেখানেই। আমি তো নেওয়ার জন্য কি বলব আর তিন পায়ে খাড়া। কিন্তু উনি তো রাজী না। বিয়ের পর তার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, Self esteem এসব বলে কয়েকবছর থামিয়ে রাখল। ঠিক আছে আমিও মেনে নিয়েছি, যাক সে যখন এতো কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে আগে ক্যারিয়ার সেটেল করে নিক। এই ক্যারিয়ার সেটেল করতে করতে চলে গেল পাঁচ-ছয় বছর। এরপর গানাবাজানা শুরু করল, সামনে প্রমোশন আর কয়েকটা দিন সোনা, আমি একটা বড় পেট নিয়ে ভাইভা দিতে যাব কেমন লাগবে, বলো তো। ঠিক আছে সেটাও মেনে নিলাম। এরপর একবার তাকে ফাঁকি দিয়েই বাচ্চা আনার কাজ করলাম। প্লানমতো সে কনসিভও করল। কিন্তু তখন সে জার্মানিতে একটা পোস্ট ডক্টরাল কোর্সের স্কালারশিপ পেল। সে আমাকে চোখ রাঙ্গালো, কেন আমি তার অজান্তে এই বেকুবের মতো কাজ করেছি। তারপর আরো কিছু কথা শুনিয়ে সে এবরশন করিয়ে জার্মানি চলে গেল। আমি কিছুই বলতে পারলাম না।
মনে হলো মোখলেছ সাহেবের চোখের কোণে চকচক করে উঠেছে। একপর্যায়ে এক ফোঁটা পানিও মনে হয় গড়িয়ে পড়ল তার চোখের কোণ থেকে। আমি নির্বাক। কি বলব অথবা আমার কি বলা উচিত।
মোখলেছ সাহেব নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, জার্মানি থেকে আপনার ভাবি দেশে এসেছেন বছরখানিক হলো। এরপর থেকে অবিরাম চেষ্টা করে চলেছি একটা বাচ্চার জন্য। ভাই কোন মতেই কিছু হচ্ছে না। এর মধ্যে দেশের সব নামকরা ডাক্তার পর্যন্ত দেখিয়েছি। কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা।
মোখলেছ সাহেব এবারে আরো একটু আবেগসঞ্চার করে বললেন,
- তৈমুর ভাই বলবেন এখন আমি কি করব। সময়ে যেটা আমাদের হাতে এসে ধরা দিল সেটা আমরা কি দুঃসাহসে অস্বীকার করলাম। আর এখন শত চেষ্টায়, শত আরাধনায় আমরা তা পাচ্ছিনা। ভাই, সত্যি বলতে কি আমার এখন ঘরে ফিরতেই মন চায়না। সে ঘর আমার কাছে মনে হয় যেন অভিশপ্ত। এমনকি আমার স্ত্রীকেও আমি এক মুহূর্তের জন্য সহ্য করতে পারছি না। ঘরের ভেতরে ঢুকলেই কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরছে। অথচ আমার মনে হয় এসব ব্যাপারে আমার স্ত্রীর কোন বিকার কিংবা কোন অপরাধবোধ নেই।
আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে মোখলেছ সাহেবের কথাগুলি শুনছিলাম। মনে মনে ভাবলাম এই একই ঘটনা একই ভাবে মোখলেছ সাহেব না হয়ে তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে ঘটত, তাহলে কি হতো! আমি কোন গ্রামগঞ্জের পুরুষ শাসিত সমাজের কথা চিন্তা করছি না। চিন্তা করছি আধুনিক শিক্ষিত পরিবারের কথা। এক্ষেত্রে মোখলেছ সাহেবকে নানামুখি কথার মুখোমুখি হতে হতো হয়তো অথবা তাকে বলা হতো নপুংশক। আসলে আমি নিশ্চিত ভাবে জানিনা ঘটনা কি ঘটত। তবে আমার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে এটা একপ্রকার পুরুষ নির্যাতনেরই নামান্তর মাত্র।
একজন পুরুষ সর্বোত ভাবে সন্তান জন্মানো, লালনপালন, ভরণপোষণের উপযুক্ত কিন্তু শুধুমাত্র স্ত্রীর জিদ, ক্যারিয়ার এবং তার না এর কারণে এক জীবনে তাদের সবথেকে আরাধ্য সন্তান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে হলো। ভাবছি, এক্ষেত্রে মোখলেছ সাহেবের করণীয় কিছু কি ছিল! সে এর বিহিত কিভাবে করতো! এতো ছাড় দিয়ে এসে এখন তিনি যদি একটা সন্তানের আশায় আবার নতুন করে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমাদের এই আবেগী সমাজ কাকে দোষী সাব্যস্ত করবে? কাকে ছিছি করবে? কাকে বলবে দুশ্চরিত্র, লম্পট?
আমার মনে হয় উত্তরটা আমার মতো আপনারাও নিশ্চিত ভাবেই জানেন!

পর্ব- পাঁচ.
রেষ্টুরেন্ট থেকে যখন বাসায় ফিরলাম প্রায় নয়টা তখন।মোখলেছ সাহেবের কথাগুলো শুনার পর থেকে মনটা বেশ ভার ভার লাগছে। ঘরে ঢুকতেই টুনি খুব চিন্তিত হয়ে বলল, কি ব্যাপার এতো দেরি হলো যে, মুখটা এতো কালো দেখাচ্ছে কেন? লাইসেন্সধারী কাজী সাহেবের দ্বারা তাঁর বাবা-মা আর আমার বাবা-মা সহ শত শত মানুষের উপস্থিতিতে সকল আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিয়ে করা একেবারে বৈধ বৌ আমার টুনি। ওর নাম আসলে টুনি না, এই নামেরও একটা কাহিনী আছে, সেটা পরে বলছি। এস.এস. সি'র সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার নাম 'মরিয়ম বিনতে তাফিক'। এ যুগেও আমাদের বিয়ে হয়েছে একেবারে সেই আদি কালে যেভাবে বর বা কনে কেউ কাউকে একটিবার না দেখেও বিয়েতে বসতো সেভাবে। আমার কাছে বিয়েটা ঠিক মনে হয়েছিল " উঠ্ ছোঁড়া তোর বিয়ে।"
তখন সবে ভার্সিটি পাস করে একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ডাটা কালেকশনের কাজ করছি। কোন স্থায়ী কোন চাকরি নয়। এই আছে, এই নেই। এই চাকরিটা পেতেও বহু কাহিনী করতে হয়েছে। চাকরির জন্য ঘুরতে ঘুরতে আমার চটিজোড়া একেবারে মাটির সাথে মিলিয়ে যাচ্ছিল , মাঝে মাঝে পীচঢালা রাজপথের গরমে মনে হতো পা'গুলো যেন মোমের মতো গলে গলে পড়ছে। নাটক সিনেমা উপন্যাসে নায়কদের চটির অবস্থা যা হয় আমারগুলোর অবস্থা তার থেকে আরো অনেক বেশি বেহাল। একবার একপাটি চটির ফিতা রাস্তায় মাঝপথে ছিঁড়ে গেল। মুচির কাছে নিতেই রাজ্যের যত বিস্ময় নিয়ে একবার সে আমার দিকে তাকায় আর একবার চটিজোড়ার দিকে তাকায়। আমি তার তাকানোকে মোটেই পাত্তা না দিয়ে পাশ দিয়ে ছুটে চলা নামিদামী সব গাড়িগুলো দেখতে শুরু করলাম। চটিজোড়া সেলাই করতে নিয়ে আমারো কম লজ্জা হচ্ছিল তা কিন্তু নয়। হঠাৎ একটা বুদ্ধি মাথায় খেলে গেল। সেই মুচি সাহেবের তাচ্ছিল্যকে ততোধিক তাচ্ছিল্য করে একটা গাড়ীর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ালাম, মুচির চোখকে আড়ালে রেখে জোরে চিৎকার করে বললাম, তুই যা আমি আসতেছি। ওই বেটা মুচিকে বোঝালাম গাড়ীওয়ালারা আমার বন্ধুমানুষ, তাদেরকেই পাত্তা দেইনা আর আপনি তো মশায় 'হে মুচি'। তারপর তার দিকে তাকিয়ে বললাম আমার বাথরুমের স্যান্ডেল এগুলো, দেনতো ভাই তাড়াতাড়ি আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। যেখানেই খবর পাই সেখানেই দৌঁড়ে যাই। আমার পরিবারের অবস্থা ছোটবেলার লিংকন সাহেব, এডিসন সাহেব, হিটলার সাহেব,কবি নজরুল, মোদী সাহেব, শেখ সাদী বা কহরীল জিব্রান কারো থেকে কোন অংশেই ভালো ছিল না। বোধবুদ্ধি হবার পর থেকে বাবাকে বিছানায় দেখে আসছি। সে অর্থে আমরা যতটুকু এসেছি আমাদের মা আমাদের পরিবারকে এ পর্যন্ত একক ভাবে টেনে তুলেছেন। বড় অবাক হয়ে যাই যখন মা'র কথা ভাবি। এক অক্ষর পড়াশোনা না জানা একজন মহিলা যিনি এগারো বছর বয়সে এ বাড়ির বৌ হয়ে এসেছিলেন, সেই বালিকাবধূ কালের পরিক্রমায় আমাদের ছয় ভাই-বোনের প্রত্যেককে পড়ালেখা শিখিয়েছেন, খেয়ে পড়ে বাঁচবার পর্যায় তৈরী করে দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মে যেসকল দেবতার পূজা করা হয় তাঁদের প্রত্যেকেই কোন না কোন ঘটনার মাধ্যমে দেবতা হয়ে এসেছেন। আমার জানা নেই তারা কাকে দেখে দেবী দূর্গার আরাধনা করেন। আমার মা আমাদের দেবী দুর্গা। টিউশনি করে যেকটা টাকা পেতাম তার সিংহ ভাগই বাড়ীতে পাঠিয়ে দিতাম। বাবার তখন বয়সের সাথে অসুস্থতাও বেড়েছে। ঔষুধের খরচও বেড়েছে অনেক। কিন্তু বিছানায় পড়ে থেকেও তাঁর হম্বিতম্বি তখনো এতোটুকুও কমেনি। বরং বয়স বাড়ার সাথে বাবার রাগ- অভিমান যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। বেশিরভাগ রাগারাগি, হুংকার মার সাথেই। মাকেও দেখতাম কি ঠান্ডা মাথায় বাবার সব অন্যায় আব্দার, তেজী হুংকার- নির্লিপ্ত আর সৌম্যভাবে সমাধান করে চলেছেন। জীবদ্দশায় মাকে কখনো কারো সাথে, বাস্তবিক অর্থেই পৃথিবীর কোন প্রাণীর সাথে সামান্যতম উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনিনি। এমন আমাদের বাড়ীর হাঁস মুরগী, ছাগলগুলোর সসাথে পর্যন্ত না। কিন্তু আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে একটা আজব ব্যাপার কাজ করত, বাবা সারাদিন বিছানায় শুয়ে আমাদের বকাঝকা দিয়ে চলেছেন, তাতে আমাদের বিন্দুবৎ চ্যেৎবোধ নেই। কিন্তু যেইমাত্র আমাদের ভাইবোনদের কাউকে মা শীতল একটা কণ্ঠে নাম ধরে ডাকতেন সে সময় জগৎ সংসারে যেন নেমে আসত মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা, পৃথিবী যেন হয়ে যেত পিনপতন নিরবতার নিরহংকারী একখন্ড ভূমি । মা যদি কারো উপর কোন কারণে রাগ করতেন, তাহলে তিনি শুধু এবার দু'চোখ দিয়ে একটা শ্যেন দৃষ্টি দিতেন, আর তাতেই ভষ্ম হয়ে যেতাম আমরা। আমাদের সাথে মায়ের সম্পর্কটা অদ্ভুত রকমের, বড়ই রহস্যঘেরা। আমার সারা জীবনে কখনই মাকে আমাদের কোন ভাইবোনকে কোন বকাঝকা অথবা শাস্তি দিয়েছেন দেখিনি। তারপরে আমাদের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ভয় পেতাম যে মানুষটিকে তিনি আমাদের মা, আবার একেবারে নির্দ্বিধায় নির্ভেজাল অবারিত ভালোবেসেছি যাকে, তিনিও হলেন সেই মা, আমাদের সকলের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
প্রথম জীবনে ভার্সিটি পাস করে দু' তিন জোড়া চটি পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে, টাকা দিয়ে কেনা প্রতিটি পয়সার মূল্য থেকে একটু বেশীই উসুল করে, অস্থায়ী একটা চাকরি পেয়েছি মাত্র। তাও পেলাম সেই অফিসের প্রধান বরাবর সাহস করে একটা মহাকাব্যিক চিঠি লিখে ফেলেছিলাম বলে হয়তো। চিঠিতে কি কি লিখেছিলাম তা এখন আর মনে করতে পারিনা, তবে এটির বিষয়বস্তু নিশ্চিতভাবেই ছিল এক মহাসাগরসম দুঃখগাঁথা। সেই অফিস প্রধান নেহায়েত ভালো মানুষ ছিলেন বলে মনে হলো কারন চাকরিটা আমার হয়েছিল কোনরকম মামাচাচা অথবা অশরীরী কোন তদবির ছাড়াই। হোক অস্থায়ী তবুওতো একটা গতি হলো।
এর মাঝে গ্রাম থেকে জরুরী খবর এলো, বাবার শরীর খুব খারাপ, আমাকে দ্রুত গ্রামে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি সবকিছু ফেলে বাড়ির দিকে ছুটলাম। বাবা সারাজীবন বিছানায় পড়ে থাকলেও সব সময় মনে হতো মাথার উপর একটা ছাদ তো আছে। গ্রামে পৌঁছে দেখলাম বাবার অবস্থা যতটা খারাপ বলা হয়েছিল তেমন কিছুই নয়, বরং বাবার কাছাকাছি পৌঁছাতেই, বাবার সেই দুপাটি দন্তবিহীন প্রশ্রয়মাখা মুখ আর ছেলেকে কাছে পাবার প্রাপ্তির সুখসুখ শাণিত হাসি। সব সময় কোন বিরতির পর বাড়িতে ফিরলে বাবাকে যেভাবে দেখে এসেছি ঠিক সেরকমই। বরং বাবা তাঁর দন্তহীণ মুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে একটা ছেলেমানুষি হাসির সাথে বলল,
- খোকা, তোর বিয়ে।
বাবাকে যেহেতু এতো সুখী দেখাচ্ছে এবং বাবা কথাটা বলবার পর থেকেই মনে হতে লাগল সবাই যেন আমার পানে চেয়ে মিটমিটে হাসছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে শতভাগ নিশ্চিত আমি ব্যাপারটা আসলে আমার বিয়েই।
বাবার খায়েশ হয়েছে বড়ছেলের বৌয়ের মুখ তাকে দেখেই দুনিয়া ছাড়তে হবে। মাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম। মা প্রচ্ছন্ন সম্মতির হাসি দিয়ে বললেন, বয়স তো তোর কম হলোনা, আজ হোক কাল হোক বিয়ে তো করতেই হবে, তিমু। যা বুঝার বুঝে পেলাম। আমার মনে হলো মা জীবনে সেই প্রথম কোন ভুল একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। যতই বলি, আমার চাকরি নেই, খাওয়াবো কি, কোথায় রাখব, কোন কথাতে কর্ণপাত করল না কেউই। কন্যাও একেবারে দেখেশুনে ফাইনাল করা শেষ। পাশের গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন জমিদার, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার জনাব তাফিক মিয়া। ছোট বোন নিজে যেঁচে এসে বলল মেয়ে নাকি দুর্দান্ত সুন্দরি, তার উপরে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম শ্রেণীতে পাশ এবং রাজশাহী বোর্ডে সম্মিলিত মেয়েদের মেধা তালিকায় ১৮ তম স্ট্যান্ড করা। মেয়ের জীবনের নাকি একটাই চাওয়া, যার সাথেই বিয়ে দেওয়া হোকনা যেন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ছেলে হয়। দশগ্রামে একমাত্র আমিই যেহেতু বিবাহযোগ্য ঢাবিতে পড়াশোনা করা পাত্র তাই প্রস্তাবটা যথারীতি মেয়েপক্ষ থেকেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিল।যেন বাতায়ন তো খোলাই ছিল, অপেক্ষা শুধু চোখ গেল পাখির ডাক শোনা। পাখি যেহেতু ডেকেই ফেলল মন কি আর উতলা না হয়ে থাকতে পারে।
মেম্বার সাহেবের বাড়ির মেয়ে বলে কথা। যে মেম্বারের সুনামের কোন অন্ত নাই, জীবনে কোনদিন নির্বাচন করে হেরেছেন এমন রেকর্ড নাই, তাও তিনি কখনো কোন দলের প্রার্থী নয়, তিনি সব সময়ই ছিলেন স্বতন্ত্র। মেম্বার সাহেবের সন্তান একটাই, আর তার কোন চাওয়া মানে অবশ্যই সেটা পূরণ করা, বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে মনে করেন তিনি। একমাত্র কন্যার সামান্য এতোটুকু একটু সাধ পূরণকল্পে পুরোপুরিভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। অনেক খোঁজখবর লাগিয়ে পাত্র হিসেবে তিনি আমাকেই সর্বাগ্রে বিবেচনা করেছেন।তাঁর চাওয়ারও তো একটা মূল্য আছে। কাজেই আমাদের বাড়ী থেকে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করা তো চিন্তাই করা যায়না, বরং এ প্রস্তাব যেন কাঠাফাটা গরমে মেঘ না চাইতেই দমকা শীতল হাওয়া সমেত একপশলা শান্তির বারি। বৃষ্টিজলের সাথে ছোট ছোট শিলার মতো বোনাস হিসেবে রয়েছেই- সুন্দরি মেয়ে, গায়ের উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, ভাল ছাত্রী এবং দশ গ্রামে মেয়ের চরিত্র নিয়ে কষ্মিনকালে কোন কটু কথা শোবা যায়নি। তার উপর হবু বেহাই সাহেবের বাড়ীতে মেম্বার সাহেব সকালে যদি কাঁঠাল পাঠান তো বিকেলে পেঁপে আর রাতে গাছপাকা আমের ঝুঁড়ি।
অস্থির অভিনব অপার্থিব এক যন্ত্রনা চলছিল আমার মনপ । মন চায়না বিয়ে করি কিন্তু আমার জন্ম ও জীবনদাত্রী মা শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়েছেন তাতেই তো সকল নড়াচড়া বন্ধ। মা'র কোন কথার বিরুদ্ধতা করব সেরকম চিন্তা কখনও কল্পনাতেও আসেনি তাই গলায় গামছা বেঁধে বিয়ে করার মানসিক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। কিন্তু খুব অভিমান হচ্ছিল আমি ভার্সিটিতে পড়াশোনা করা ছেলে, আমার যে কোন পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে সেটা কেউ একটি বারের জন্য মাথায় নিলনা, এমনকি মা পর্যন্ত না!
বাড়িতে বিশাল আয়োজনযজ্ঞ চলছে। লাল- নীল কাগজ কেটে কেটে মোটা সুতলীতে আটার আঠা দিয়ে লাগানো, উঠোনে আল্পনা করা সহ নানারকম ভাবে বিয়েবাড়ি সাজানোতে ছোট ভাইবোনেরা সহ পাড়া প্রতিবেশী সকলে বিশাল রকম কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি বর, একমাত্র আমিই সে বাড়ীতে অপাংক্তেয় যেন। সবাই নিজনিজ কাজ করে চলেছে আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। মা- ও আমাকে কিছু বলছেনা। আমি যে বিয়ে করব তেমন কিছুও বলিনি তবুও সবার এমন আচরণ আমার কাছে কিছুটা বিরক্তিকর লাগছিল। দেখতে দেখতে সেই মহেন্দ্র ক্ষণও এসে গেল। আমি বর সেজে টোপর মাথায় মেম্বার বাড়ী থেকে পাঠানো একটা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলাম। কাজী এলো, মেম্বার সাহেবের শত শত সমর্থক এলো, আমার হাঁটতে- চলতে না পারা বাবাও এলো পালকিতে চড়ে। না চাইলেও মুখে রুমাল ধরতে বাধ্য হলাম, বিয়ে পড়ানো হলো, বরের জন্য বানানো বিশাল স্টেজে পাশে বসা লোকজন ঘুতিয়ে-ঘাতিয়ে দাঁড়া করিয়ে দিয়ে লম্বা সালাম দেওয়ালো, বরের খাবার টেবিলে নিয়ে বসানোর পর বিশাল ঘোমটা মাথায় বৌকে বরের পাশে বসানো হলো, আস্ত এক খাসি দাঁড়ানো বিশাল এক থালায় একসাথে বর-কনেকে খেতে দেওয়া হলো। তখনও কিন্তু বউকে আমি দেখিনি, দেখার ইচ্ছে যে করছিল না তাও না, কিন্তু উপায় নাই গোলাম হোসেন। সু্যোগের অভাবে চরিত্রবান হয়েই সেই বিশাল থালা থেকে কিছু খাবার খেতে চেষ্টা করছিলাম। আশেপাশে থেকে সবাই মিলে অনেক করে বলবার পর কনে যখন খাবারের থালায় তার লাল টুকটুকে মেহেদী রাঙানো হাতটি বাড়ালো, তখন যেন তার ওইটুকু অতোটুকু বাড়ানো হাতটি দেখে মনে হলো," আমি দেখিলাম,তার খানিকটা হলেও কিছুতো দেখিলাম।"

পর্ব- ছয়.
মরিয়ম বিনতে তাফিক আমার অনেকটা অনিচ্ছাতেই ঘরের বৌ হয়ে এলো। আমাকে বিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত যে মা'র মোটেই ভুল সিদ্ধান্ত ছিলনা আবারো তা প্রমানিত হলো। টুনি আমার বউ হবার পর থেকে আমার জীবন রঙিন হওয়া শুরু হল। প্রথমদিন বিয়ে করে বাড়ীতে যেদিন তুলেছিলাম তখন সে এইচ.এস.সি পাস করা কিশোরী, আর আজ সে ডক্টর মরিয়ম। এখনো মনে পরে প্রথমদিন সে যখন ঘরে এলো কত হাস্যকর কান্ড ঘটিয়েছি। তাকে প্রথম যখন নাম ধরে ডাকব কি নামে ডাকব বুঝে উঠতে পারছিনা। মারিয়াম নামটা আমার পছন্দের কিন্তু মরিয়ম নয়। তাই মনে হলো তার নামের শেষটা দিয়েই ডাকি। যেই বলতে শুরু করলাম,
- আচ্ছা তাফিক...
কথা ফুরোবার আগেই কথা কেঁড়ে নিল সে, বলল-
- ও মা। আপনি আমার বাবাকে ডাকছেন কেন। আমিতো বিনতে তাফিক, তাফিক মিয়ার কন্যা।
আমি একটু ভ্যবাচাকা খেয়ে গেলাম। বললাম মরিয়ম নামটি অনেক বড় এনামে তোমাকে সবসময় ডাকতে পারবনা। তোমার ডাক নামটা বল। সে বলল,
-আমারতো কোন ডাক নাম নেই। বরং আপনি একটা নিজের মতো নাম দিয়ে নেন। নতুন নাম দিলে আকিকা দিতে হবেনা, আব্বু তো ছোট বেলায় একবার আকিকা করেছেই।
তার কথাগুলো আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন টুনটুনি পাখির মতো। সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম তার নাম হবে টুনি, সে হবে আমার টুনি পাখি। বলতেই সে ঝলমল করে খলখলিয়ে হেসে উঠল। সে বলল টুনি নাম তার অনেক পছন্দ হয়েছে।
সেদিনের সেই টুনি এখন আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, আমার সকল দুঃখ সুখের সাথী, সব খারাপ ভালো লাগার অংশীজন।
মোখলেছ সাহেবের কথাগুলো বললাম তাকে।
- আমার মনে হয় পরবর্তী বইটা 'পুরুষ নির্যাতন' নিয়ে লিখে ফেলি, কি বল টুনি?
সে বলল,
- মোখলেছ সাহেবের ঘটনাকে তুমি কেন পুরুষ নির্যাতন হিসেবে নিচ্ছ। যে নারী নিজেকে সন্তান উদযাপনের যন্ত্র হিসেবে না দেখে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে যত্নশীল হয় এবং সামাজিক, পারিবারিক, দাম্পত্য বাঁধাকে অতিক্রম করতে পারে তাকে তো সমাজের শ্রদ্ধা করা উচিত,
আর যে স্বামী অন্যায়ভাবে, অসম্মতিতে সন্তান চাপিয়ে দিতে চায়, সেটাকে কি বলবেন, তৈমুর হাসান। মোখলেস সাহেবের কথা অনুযায়ী মাত্র একবছর আগে তার স্ত্রী দেশে ফিরেছেন এবং তারপর থেকে চেষ্টা চলছে আবার। ভালো! কিন্তু এত বছর ধরে যে পরিস্থিতি চলেছে, এখন মাত্র একবছর না যেতেই হতাশ, বিকল্প খোঁজার চিন্তা মাথায় এসে গেল। সবেতো উনার ৩৭ বছর, এটা কি খুব বেশী বয়স! হ্যাঁ তুমি বলতে পপার তার স্ত্রী নিঃসন্দেহে উচ্চাকাংখী, অবশ্যই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন, কিন্তু পুরুষ নির্যাতনকারীনি কি! একজন মানুষ ক্যারিয়ার সচেতন - হয়তো একটু বেশী মাত্রায়, তাই বলে আমি একে পুরুষ নির্যাতন বলতে পারিনা।
আবারও আমার সব চিন্তাগুলোকে টুনি গুবলেট পাকিয়ে দিল। সে সন্ধ্যায় মোখলেছ সাহেবের সাথে কথা বলার সময় থেকে ওই পুুরুষ নির্যাতন শব্দটা ঢুকেছিল। এখন মনে হচ্ছে টুনির কথায় যুক্তি আছে। এটাকে পুরুষ নির্যাতন বলে চালানো যাবে না। টুনিকে প্রশ্ন করলাম,
- তাহলে তুমি বলছো পুরুষ নির্যাতন আমাদের সমাজে হচ্ছে না?
- না আমিতো তা বলিনি, তবে সেটা কোন ঘটনা বা প্রেক্ষিতে ঘটছে আগে সেটা দেখতে হবে।
- তোমার কাজই হলো Women Empowerment নিয়ে তুমিতো এমন করে বলবেই।
ইচ্ছা করেই একটু খোঁচা মারলাম। টুনি কিছুই না বলে শুধু হাসল। তার এ হাসির মানে আমি বুঝি। এই হাসির মানে হলো, মিঃ তিমু তুমিও জানো তুমি ভুল। সারাটা জীবন যখন আমি তার কথাকে না মেনে জোর করে কিছু প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছি, তখনি টুনি এই হাসিটা দেয়, তারপর সে বিষয়ে একদম চুপ,আর কেন কথাই বলেনা। কাজেই আমাদের মধ্যে কখনই ঝগড়া হয়না। টুনির এ গুনটাকে আমি খুন সম্মান করি। টুনি বলল,
- তাড়াতাড়ি শাওয়ারে যাও। কিছুক্ষণ পানির নিচে দাড়িয়ে সব চিন্তা বাদ দিয়ে গোসলটা করে নাও, আরাম পাবে।
এরকম সময়ে টুনি যা বলে আমি তাই করি। বাধ্য ছেলের মতো গোছলে যাব। তার আগে আমার কন্যা টাপুরটুপুর এর ঘরে ঢু মারব, তাকে একটা হাগ দিব এটা জানে টুনি। তাই আগেই সাবধান করে দিল টুনি, প্লিজ ফ্রেশ না হয়ে টুপুরের কাছে যেওনা, মেয়েটার শরীরটা এমনিতেই ভালো যাচ্ছে না, আজও সারাক্ষণ হাঁচি দিয়েছে সে। আমি বাধ্য ছেলের মতো বাথরুমেই ঢুকলাম। আমাদের টুপুরটা খুব স্পর্শকাতর, আট বছর বয়স হলো অথচ এখন তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে শূণ্য বললেও কম বলা হবেনা।
মাথায় শীতল পানির ধারা পড়ছে আর আস্তে আস্তে শান্ত হচ্ছে মন। আমার মন বলছে পুরুষ নির্যাতন সমাজে আছে। কিন্তু আমাদের প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেটাকে নারী নির্যাতনের মতো গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে না। পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনের ঘটনা পত্র-পত্রিকায় ঢালাওভারে প্রচার হলেও নারী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা তেমনটি চোখে পড়েনা। পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি চেপে যাওয়া আর নারী নির্যাতনের সংখ্যা প্রকাশ পাওয়ায় নারী নির্যাতন ব্যাপক মনে হয়। অনেক পুরুষ আবার ব্যক্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নারী কর্তৃক নির্যাতিত হলেও প্রকাশ করছেনা। নারী নির্যতন মামলায় আইন- আদালতের সহযোগীতা পাওয়া গেলেও পুরুষ নির্যাতনের বিষটিকে কম গুরুত্ব দেয়াতে এর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন নারী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা বাড়বে বৈকি কমার কথা নয়। মাঝে মাঝে তো পত্র-পত্রিকায় কিছু কিছু ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশ করাও হচ্ছে। প্রিয়তমা স্ত্রী কিংবা বান্ধবী বিষাক্ত নাগিনী হয়ে মরণ ছোবল দিচ্ছে স্বামীকে বা প্রেমিকাকে। কেড়ে নিচ্ছে তার প্রাণ। কখনো আবার প্রবাস থেকে পাঠানো স্বামীর টাকা পয়সা ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, পরকীয়া প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাচ্ছে এমনকি স্বামীকে ডিভোর্স দিচ্ছে। অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে বা যৌতুক নিরোধ আইনে মিথ্যা মামলা করে জেল হাজতে পাঠিয়ে নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক পুরুষ।
মাথা মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বের হতেহতে মনে হল টুনি যাই বলুক মোখলেস সাহেবের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। অন্তত আমার নেক্সট বইয়ের জন্য চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম কিন্তু সেভাবে মাথায় কিছু আসছিল না। যাক মোখলেস সাহেবের কারণে নতুন বইয়ের কাজটা শুরু তো করা যাবে।
রাতে ঘুমোতে যাবার আগে কথাটা আবার তুললাম,
- টুনি তুমি একটা জিনিস লক্ষ করে দেখ, নারীদের বিভিন্ন দাবীদাওয়া, যেকোন নির্যাতনের ঘটনায় রাজপথে মানববন্ধন বলো,সভা সমাবেশ বলো, সবকিছুতে নারীর পাশে থাকে তো পুরুষরাই। নারী নির্যাতনের বিপক্ষে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই একাত্মতা প্রকাশ করলেও পুরষ নির্যাতনের ব্যাপারে কেউই কোন ভূমিকা পালন পালন করছে না।
- জি তৈমুর হাসান যুগে যুগে নারীদের রক্ষার জন্য ইশ্বরচন্দ্র, বেগম রোকেয়ারা এগিয়ে এসেছেন, পুরুষের রক্ষায় অগ্রদূত হন আপনি, একসময় সমাজের পুরুষরা লেখক ও বিজ্ঞাপণী সংস্হার গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকুরে জনাব তৈমুর হাসানকে শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। তিমু তুমি এগিয়ে যাও টুনি আছে তোমার সাথে।
আমি খুব বিরক্ত হয়ে বললাম,
- আচ্ছা তুমি যেখানে কাজ কর সেটাও তো নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে। কিন্তু তোমাদের সংগঠনের মতো কোন নারীবাদী সংগঠনগুলো কি কোনদিন খুঁজে পায়না এ সমাজে তোমাদের নারী সদস্যরা পুরুষের উপর কোন অত্যাচার, কোন নির্যাতন করছেনা!
- দেখ তিমু আমি তোমার সাথে মোটেই কোন ফান করছি না। একথা স্বীকার করতেই হবে যে আমাদের সমাজেও প্রকাশ্যে অথবা লোকচক্ষুর অন্তরোলে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিতভাবেই ঘটছে। এমন অনেক এলাকার খবর আমাদের কাছে আছে প্রায় প্রতিরাতে স্ত্রীর হাতে মারধর খেতে হয় স্বামী নামের সেই পুরুষটিকে। বেচারা স্বামী লোকলজ্জা আর হেয় প্রতিপন্ন হবার ভয়ে মুখ খুলছেনা। খুলতে পারছে না। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা উল্টালে তুমিও যা দেখ, আমিও তাই দেখি। স্ত্রী কর্তৃক স্বামী তালাক, মামলা-হামলা, পরকীয়ার বলি- কিন্তু যা আমরা দেখছি সেটাই শেষ সংখ্যা নয়। এর অন্তরালেও থেকে যায় আরো শত শত ঘটনা। যা কোনদিনই প্রকাশিত হবেনা, আর তুমি আর আমিও তা কোনদিন জানতে পারবনা।তুমি কাজ শুরু কর, তোমার যতরকম তথ্য লাগবে আমি এনে দেবার চেষ্টা করব।
এই না হলো আমার টুনি। আমার মন বলছিল টুনি আমার সাথে এক পর্যায়ে আমার সাথে একমত হবেই। টুনি হলো সেই মেয়ে যাকে কোনদিন যুক্তি ও সত্যের বাহিরে আমি কোনরকম কাজ করতে দেখিনি। তাঁর আজীবনের লালিত বিশ্বাস যদি কেউ যুক্তির মন্ত্রে খন্ডাতে পারে তাহলে সেটাকে মেনে নিতে কখনোই দ্বিধাবোধ করেনি সে। এতক্ষণে শক্তি, সাহস আর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম।

(প্রথম ছয় পর্ব....)

#tamimbooks

Comments

Popular posts from this blog

♣"প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য" ♣

অশ্লীল কবিতা ও কবি প্রথম পর্ব কবি তার কবিতায় শব্দের খেলা খেলবেন এটাই স্বাভাবিক। সাহিত্যে শব্দ নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোন মানদন্ড নেই, কবিতাকে কোন কাঠামোর মধ্যেও সীমাবদ্ধ করা যায় না। শিল্পী স্বাধীনভাবে শিল্প সৃষ্টি করবেন, শিল্পের মাঝে শ্লীলতা-অশ্লীলতা খোজার চেষ্টা অর্থহীন। বাংলা কবিতায় যেসব শব্দকে আমরা অশ্লীল বলে থাকি, তার প্রয়োগ নতুন নয়। যেমন হেলাল হাফিজের, ' আমিও গ্রামের পোলা, চুতমারানী গালি দিতে জানি ' হুমায়ুন আজাদের, ' অপার সৌন্দর্য্যের দেবী সারারাত চুষবে নষ্টের লিঙ্গ' কিংবা কবি মলয়ের ' প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুঁতার ' অশ্লীল শব্দে ভরপুর অসাধারণ সুন্দর একটা কবিতা। এই কবিতা গুলিতে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার থাকলেও কোন অশ্লীলতা প্রকাশিত হয় নি। অশ্লীল শব্দের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে শ্লীল সৌন্দর্য্য, ফুটে উঠেছে জীবনবোধ, প্রকাশ করে অর্থ। অর্থাৎ সেগুলি হয়ে উঠেছে এক একটি কবিতা যা পাঠকের মন জয় করতে সক্ষম। নির্মলেন্দু গুণ ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী চত্বরে জাতীয় কবিতা উৎসবে মঞ্চে আমন্ত্রিত কবি হিসেবে নির্মলেন্দু গুণ কবিতা আবৃত...

পুড়ে যাচ্ছি আমি, পুড়ে যাচ্ছে অন্তপুর

পুড়ে যাচ্ছি আমি , পুড়ে যাচ্ছে অন্তপুর আমার চোখে পড়েছে তোর চোখ তাতেই পুড়ে চৌচির , তাতে শুরু সকল দুঃখ শোক অবিরাম রচে চলেছি দুঃখ সমার্থক পুড়ে পুড়ে হই আমি অঙ্গার তিলক । ফিরিয়ে নিয়ে চোখ , করেছো তুমি বেশ বেশ করেছ ! পুড়ে আমি হয়েছি শেষ । ভ্রষ্টপাখি হারায় না নষ্ট দীপান্তরে। ভেবে দেখ , দৃষ্টি তুমি ফিরিয়ে নিয়েই বাঁধন ছিঁড়ে মিটিয়ে দিয়ে , সকল নিয়ে দিয়েছো দিশা নতুন পথ , গড়েছ আগুনবাজ। বেশ করেছো ঠিক করেছো , অগ্নি করে রাজ । হতনা কভু যে নিরিবিলি সড়কসন্ধান তপ্ত ছোঁয়ায় তাপের আঁচে সৃষ্টি যত যাচ্ছে পুড়ে পুড়ে , পুড়ছে সুর তাল , পুড়ে বিবেক শান্তিপুকুর। পুড়ে হচ্ছি ছাড়খার , পুড়ে চুরচুর। চোখ ফিরিয়ে বাঁচিয়ে দিয়ে বেশ করেছো। আহাহা বেশ। আবেগসাগরে ভাসিয়ে নিয়ে। বেশ করেছো ! বেশীরকম বেশ । বেঁচে আছি তাই দেখছি যে ছল মিছিলে দেখেছি পাখিদের মৃত্যুঢল ফিরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিলে ভালোবাসি ঠিক কত বেশী ! বাসি ভাল ঐ আঁখিকোণে কাজল। ছিলেনা তুমি হৃদয়হীণা ছিলেনা কভু পাষানবীণা তুমিই , শু...