ধ্রুপদ_সাহিত্য
সময়: ভোর সাড়ে ৫ টা
স্থান - কাঠালবাগান ঢালে ধ্রুপদের ভাড়া বাসা
চরিত্রঃ
১) বাড়ীওয়ালা বখতিয়ার উদ্দীন -
বয়স ৫৫ এর কাছাকাছি। বিশাল বিত্তশালী সম্পদবান। গুলশানে ২টি, বনানীতে ১টি প্রমান সাইজের ফ্ল্যাটবাড়ী থাকলেও দুইটা বেশী টাকার আশায় কাঁঠালবাগান ঢালের অন্ধকার ঘুপচি কানাগলির ভেতরে বৃষ্টির সামান্য পানিতে একহাটু জল জমে যাওয়া শ্বশুর আব্বাজান সূত্রে প্রাপ্ত ছোটছোট তিন ইউনিটের পাঁচতলা বাড়ীর সবচেয়ে ছোট ইউনিটটিতে থাকতেই ভালোবাসেন। বাড়ীটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো দিনের বেলাতেও ১০০ ওয়াটের কম পাওয়ারের বাতি লাগালে ঘরটা ঘুটঘুটে গা ছমছম করা অন্ধকারময়ী বলে মনে হয়।
২) ধ্রুপদ
৩) আনছার আলী -
বয়স ৬৫ হবে। সে এই বাড়ীটির দারোয়ান। পেটের তাগিদে তাকে এই বয়সে এসেও কাজ করতে হয়। তার থেকে বয়সে কত ছোটরা চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছে, আরাম আয়েশে দিন গুজরান করছে, রিটায়ারমেন্টে পাওয়া টাকাপয়সা দিয়ে হিল্লীদিল্লী করে বেড়াচ্ছে অথচ আনছার আলীর গা-গতরে সামান্য কিছু বল অবশিষ্ট্য না থাকলেও সে ই এখন এ পাঁচতলা বাড়ীটির মূল নিরাপত্তা প্রহরী।
ঘটনা:
কাকডাকা ভোররাতে একটা কুক্কুট পর্যন্ত তখনো ডাকেনি, কুকুরগুলো সারারাত ঘেউঘেউ করে এ সময়টায় ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে চোখদুটো বুজে আরাম করার চেষ্টা করে। এরই মধ্যে ধ্রুপদের বাড়ীওয়ালা বখতিয়ার সাহেব ফজরের নামাজ পড়ে এসে গেটের দারোয়ানের সাথে চিল্লাপাল্লা শুরু করে দিয়েছে। এতে ধ্রুপদের অনেক অসুবিধার পাশাপাশি একটা সুবিধা হয়েছে বটে, এখন তাকে আর ঘড়িতে দেওয়া এলার্মটি মিস করতে হয়না, চিল্লাচিল্লিরর শব্দে এমনিতেই ঘুম ভেঙে যায়।বাড়ীওয়ালা ভদ্রলোকের ভোরের ওই সময়টায় এক দুই দিন আওয়াজ না পেলে তার কেমনজানি অস্থির লাগে। ধ্রুপদ ভাবে, "বাড়ীওয়ালা বখতিয়ার সাহেবের কথাটি মনে হলে মনের অজান্তেই নামের সাথে ভদ্রলোক শব্দটি মাথায় চলে আসে। অথচ তার কাছে লোকটিকে মোটেই ভদ্রমানুষ বলে মনে হয়না। পৃথিবীর নিয়মটাই মনে হয় এমনি কেউ যদি টাকা পয়সাওয়ালা হয় ভালো ভালো পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করে, গা থেকে ভুরভুর করে সুগন্ধি বের হয় তবে তাকে অভদ্র বলা হয়না, তিনাকে সাহেব ছাড়া আর বিকল্পকিছু ভাবাও যায়না। আবার দরিদ্রতম মানুষটি সে যত শুদ্ধ হোক, আচার দর্শন জীবনাচরণে বিশুদ্ধতম হলেও তাকে আমরা সম্মান দেবার কথা, আংকেল বলে সম্বোধন করা কল্পনার ত্রিসীমানাতেও আনি না, কারন তার যে অর্থ সম্পদ নেই, তার পরণের কাপড়গুলো যে ছেঁড়া নোংরা, শরীর থেকে ভকভক করে ঘামের দুর্গন্ধযুক্ত বদবু বের হয় যে!"
ধ্রুপদ ওই একি কথা প্রায় প্রতিদিন তার ঘর থেকে শুনে, বাড়ীওয়ালা গলা চড়িয়ে তার থেকে বয়সে বড় মানুষটিকে বলছে, তুমি মিয়া একটা বেহুদা লোক, তোমার মাথায় যদি দস্তুরমতো বাড়ি দিয়া ফাটাইতে পারতাম তাইলে শান্তি পাইতাম। যথারীতি এই সময়ে দারোয়ানের গলার লেশমাত্র আওয়াজ পায়না ধ্রুপদ।
অফিসে যাবার সময় গেটের কাছে আসতেই ধ্রুপদ আনসার আলীকে পেয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, চাচা আজকে আবার কি নিয়া!
দারোয়ান জবাব দেয়,
- বাবারে পানির মোটরের সুইচটা বন্ধ করতে দুই মিনিট দেরী হইছিল।
ধ্রুপদ কিছু না বলে সামান্য হেসে বিদায় নিল।
সারাদিন শেষে যখন সে বাসায় ফিরল দুঃখজনক খবরটা পেল। সকালে নয়টার দিকে বখতিয়ার সাহেবের বুকে ব্যথা উঠলে আধাঘন্টা পরে দুম করে চিরদিনের তরে নিথর হয়ে যান। সেই সময় দারোয়ান আনছার আলী ছাড়া আর কেউ তার সাথে ছিলনা। থাকবে বা কেমন করে, দুই ছেলে কানাডায় পড়াশোনা শেষে বিয়ে সাদী করে সেখানেই সেটেলড। মেয়ে জামাই এর সাথে অষ্ট্রেলিয়া নিবাসী। তাদের মা আছে এখন মেয়ের বাড়ীতে নাতি নাতনীদের ডিউটি পালন করতে। ছেলে মেয়েরা ফোনে জানিয়ে দিয়েছে ক্রিসমাসের এই মাসটাতে তাদের সেখানে চরম ব্যাস্ত থাকতে হয় কাজেই কেউ দেশে আসার সুযোগ পাবে না। ছেলেমেয়েদের চাচার ইসলামপুরে বিশাল কাপড়ের দোকান, মোকাম করতে সে সিরাজগঞ্জ গিয়েছে। তাকে ফোনে ছাড়াও বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা পুরোটাই ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে সকালের ডেডবডিতে আতর গোলাপজল ছিটিয়েও সুবিধে হচ্ছেনা, একটা বোটকা গন্ধ চারপাশে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। অবস্থাদৃষ্টে ধ্রুপদের মনে হচ্ছে সে শবদেহ বুঝি সেখানেই গলে পচে যাবে।
পাড়াপ্রতিবেশী মুরুব্বীররা কেউ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা এই ডেডবডি কি করা হবে। এভাবে আর ফেলেও রাখা যাচ্ছেনা। রাত যত বাড়ছে একটা পঁচাগন্ধ যেন সেখানকার বাতাসকে ক্রমশ চেপে ধরছে।
এমন সব দৃশ্য দেখলে ধ্রুপদের ভাবনায় নানান সব কথারা ভর করে,
- আহা বেচারা বখতিয়ার সাহেব, বেঁচে থাকতে তার কতই না অর্থসম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি অথচ মাত্র কয়েকঘন্টা সময়ের ব্যবধানে সে লোকটিই এ জগতে কারো কাছেই কিছুনা। এত এত সম্পদ, বাড়ীগাড়ী সন্তানসন্ততি তার অথচ মৃত্যুর পরে তাকে কবর দেবার জন্য মাত্র সাড়ে তিনহাত মাটিই পাওয়া যাচ্ছেনা। মানুষ কতই না বোকাচণ্ডী সারাজীবন শুধু টাকাপয়সা, ধন দৌলত, যাপিত জীবনে চাকচিক্য, দামী গাড়ী, বিঘার পর বিঘা ধানীজমি, ২৮০০ নাকি ৪৮০০ স্কয়ারফিটের ফ্লাট এসবের পেছনেই জীবনভর ছোটে অথচ তার প্রকৃত স্থায়ীনিবাস সেই সাড়ে তিনহাত মাটির যে বন্দোবস্ত, ফ্লাটবাড়ীর আগেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন সেটা একবারের জন্যেও ভাবেনা। ধ্রুপদ মনস্থির করে ফেলে জীবনে তার যদি কোনদিন টাকাকড়ি হয় প্রথমেই সে ওই সাড়ে তিনহাত মাটির এন্তেজাম করে রাখবে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বখতিয়ার সাহেবেট মৃত্যুর সময়ে সে মানুষটির ছোঁয়াই পেল যাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বকাবাদ্য করা ছিল তার নিয়মিতভাবে নিয়ম কাজের একটি। আহা মানুষ মানুষকে চিনার ক্ষেত্রেও কত যে বেকুবি করে! কে তোর প্রকৃত বন্ধু সেটাও খুঁজে নেবার শক্তি যে এদের নেই।
লাশকে ঘিরে বাড়ীর সামনের ছোট্ট খোলা জায়গাটিতে কয়েকজন শুনশান নীরবতায় বসে আছে। কেউ কোন কথা বলছে না, কেউ কাঁদছেও না। একসময় সকল নীরবতা বড়রকমের গ্লাস ভাঙ্গার শব্দে ভাঙল দারোয়ান আনছার আলীর কথায়,
- আপনেরা ব্যবস্থা করেন, সাহেবের লাশ এহানে এমনে ফেলায় রাখা যায়না। ব্যবস্থা করেন, আমাগো গ্রামের বাড়ীত আমার কব্বর দেয়ার একটা জায়গা ঠিক আছে, সেইখানে সাহেবেরে মাটি দিমু।
#tamimbooks
★পুরুষ নির্যাতনের ছোটছোট গল্প নিয়ে উপন্যাস★ পাঠকের বিপুল উৎসাহ আর আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে উপন্যাসটির প্রথম কয়েকটি পর্ব প্রকাশ করা হলো। "পুরুষ নির্যাতন" এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে পাঠকের মন্তব্য অতি গুরুত্বের সাথে গ্রহন করা হবে এবং প্রয়োজনে তা উপন্নাসে সন্নিবেশিত হবে। আশা করছি পুরুষ নির্যাতন উপন্যাসটি পাঠকের আগ্রহ ও ভালোবাসা কুঁড়াবে। সাথেই থাকুন, চলুন পাঠক আর লেখকের সম্মিলিত প্রায়াসে লিখা হোক " পুরুষ নির্যাতন" নামক সুবিশাল এই উপন্যাস। আরো একটি বিশেষ কথা যে কেউ, যেকোন পাঠক উপন্যাসের ধরাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন যে কোন চ্যাপ্টার , অধ্যায়, প্যারা প্রবেশ করাতে পারবেন এবং তাঁর নামও লেখক হিসেবে এই উপন্যাসে উল্লেখ করা থাকবে। চলুন শুরু করি আমাদের প্রজেক্ট : লেখকের সাথে পাঠক। (পুরুষের জন্য লিখা মানেই নারীবিরোধী না। নারীদের প্রতি শতভাগ সম্মান আমার ছিল, আছে, থাকবে। নারীদের জন্য তো আমরা সবাই আছি, আইন আছে, সরকার আছে। কিন্তু পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতিত হচ্ছে। তাদের আসলেই দাঁড়াবার কোথাও কোন জায়গা নেই। আশেপাশে ঘটে চলা এই ঘটনাগুলো আমি আমার নতুন উপন্যাস "নিরুপায় পুরুষ" এ তু...
Comments
Post a Comment