- তুমি কোনভাবেই যেতে পারবে না।
- কেন আমাকে আমার মতো চলতে দিসনা অয়ন। তোর স্বাধীনতাতে কোনদিন বাঁধা দিয়েছি! তবে, আমার সিদ্ধান্তে শুধুশুধু কেন বাঁধা দিচ্ছিস?
- বাবা, অযথা কথা বলে কোন লাভ নেই। আমি যখন ছোট, তখনকি আমাকে সবকিছু করতে দিয়েছিলে, বাঁধা দাওনি? এখন থেকে তুমি বাচ্চা, আমিই তোমাকে শাসন করব।
- এহ! ৬২ বছরের বুড়োকে বাচ্চা বলবি আর আমি মেনে নেব!
- যা'কিছুই বল, তোমাকে কোনভাবেই বৃদ্ধাশ্রমে যেতে দিবনা, দশটা-পাঁচটা না একটিমাত্র বাপ আমার। অঞ্জলি কোথায়, পাগল বুড়োটাকে তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখ।
- বৌমা, এর কথায় তুমি হাসছ!
- না বাবা, বাপ-ছেলের ব্যাপার, আমি হাসিনিতো। দেখি হাতটা, আপনার প্রেসার মাপবো।
- আর প্রেসার! হতচ্ছাড়াটাই প্রেসার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- অঞ্জলি, আর দেরী করতে পারবনা। বাবা আসি, সন্ধ্যায় দেখা হবে।
- দেখেছো, বাদরের মতো দাঁতকেলিয়ে তোমার জামাই বেরিয়ে গেল।
- বাবা, আপনারইতো ছেলে।
- ধুর! বোঝার চেষ্টা কর। সফিকুল, নারায়ন যাচ্ছে, বন্ধুদের কাছেও যেতে দিবেনা আমাকে?
- বাবা, উনারা যাচ্ছেননা, যেতে বাধ্য হচ্ছেন!
- ওই হলো, একই।
- বাধ্য হচ্ছে আর যাচ্ছে এক'না বাবা। তাদের সন্তানদের কাছে বাবা বোঝা, ছেলেবৌয়েরা শ্বশুরকে জঞ্জাল মনে করছে। ছেলে-বৌ জোড় করে তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসছে। এতদিন আপনার ছেলের সংসার করছি, আপনাকে একমুহূর্তের জন্য নিজের বাবা ছাড়া ভাবিনি।
- বৌমা তুমি বুঝবেনা, অযথা কান্না করোনা। সবচেয়ে কাছের যেজন, তোমাদের মা ছেড়ে চলে গেল সেদিনেও আমাকে কেউ কাঁদতে দেখেছে? যতবড় দুঃখ-শোকই হোক কেউ বলতে পারবেনা আমার দু'ফোটা অশ্রুজল দেখেছে। সবাই অয়নের মা'র ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবটা পেয়েছিস, একটু কিছুতে কেঁদেকেটে চোখের-নাকের পানিতে শোকের গুপ্তগু বানিয়ে ফেলিস।
- বাবা, আমরা আপনাকে সেখানে যেতে দেবনা, যেতে হলে আমাদেরকেও নিয়ে চলেন, ব্যস।
বলেই গটগট করে বেরিয়ে গেল অঞ্জলি।
বুড়োটা মনে ঘটনাগুলো জীবন্ত ভাসছে,
- স্বাদে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে চাই। তোরা কল্পনা করতে পারবিনা, যদি কোনদিন বলে ফেলিস আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে, কি কষ্টটা আমি পাবো। সেদিনই মরে যাব, সন্তান যে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, তারা তো মৃতই। সফিকুল যেদিন বলল তার ছেলেরা তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে, সেদিন যদি কোন সন্তান পিতার বুকের মধ্যে প্রবেশ করতে পারত, দেখত-একটি হৃদয় কিভাবে, কতটা শোকাহততায়, অপারগতায়, পরাজয়ে হাউমাউ করে চিৎকার করে গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়কষ্ট কি, সেখানে গেলে তারা নিমিষেই বুঝে যেত। সফিকুল ইনিয়েবিনিয়ে কিছুক্ষণ বৃদ্ধাশ্রমের উপকারিতা দু'বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর পার্কের বেঞ্চটার দিকে কেউ তাকালে দেখত, তিনজন বুড়োমানুষ কিভাবে পরম মমতায় হাত ধরাধরি করে এই মর্ত্যেই মৃত্যুপুরীর কষ্টাহত নিষ্ঠুর নিরবতা নামিয়ে এনেছে। গতদিন নারায়ন যখন বলল তাকেও বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে, তখন থেকেই বুড়োর বুকটা হুহু করে কেঁপে উঠছে। তার ছেলে বা ছেলেবৌ এমনটা যদি বলে! যত ভাবে তত তার সবকিছু ভার হয়ে আসে, নিঃসীম শূণ্যতায় ডুবে যায়, জীবনে না কাঁদা চোখদুটো থেকে কান্নাখেকোরা তীব্র দুরন্তপনায় বের হয়ে আসতে চায়। সকালে নিজথেকে বৃদ্ধাশ্রমের কথাটা তুলল, যাতে তার সন্তানের মুখ থেকে কখনো তাকে সেকথা শুনতে না হয়।
যখন, বুড়োটা কথাগুলো ভাবছিল, অঞ্জলি নাশতা বানাতে রান্নাঘরে যাচ্ছে, অয়ন খানিকটা অফিসের দিকে এগিয়েছে সেসময়ে পৃথিবীতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল- একই সময়, কারণ ও গতিতে তিনজন মানুষের চোখবেয়ে অজর ধারায় কান্না বেরিয়ে এলো।
সকালে বাপের মুখে কথাটা শুনবার পর থেকেই অয়নের মনটা ছটফট করছে, বুক ধড়্পড় শুরু হয়েছে, তার বুকেআকেউ বিশাল একটা হাতুড়ি দিয়ে সমস্ত অসুরীয় শক্তিতে সমানে পিটিয়ে চলছে। লুকিং গ্লাসে চোখ যেতেই, অয়নের অফিসের ড্রাইভার আচমকা একটা হোঁচট খেল, তার স্যার ফুপিয়েফুপিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতোই মুখে হাত ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদছে।
অঞ্জলি রান্নাঘরে ঢুকতেই মনে হলো, যেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটি হারিয়ে ফেলতে চলেছে। ছেলেমেয়েরা তখনো বিছানায়, মুখে আঁচল চাপতেই সন্তর্পণে চোখ বেয়ে অশ্রু পড়তে শুরু করল। রান্নাঘরে দরজা চাপিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল সে।
একথা সেকথা ভাবতে ভাবতেই, সফিকুল আর নারায়নের কথা মনে হতেই, বুড়োটার ভিতরে আজন্ম লালনকরা বীরপৌরুষিক কাঠিন্য নিমিষেই বালির বাঁধ ভেঙে পড়বার মতো চুরচুর হয়ে ঝড়ে পড়ল। ঝাঁপিয়ে বালিশে মুখ চাপতেই বুড়োটার দু'চোখের অতলাতল কান্না বেরিয়ে এলো ভীষণ নিঃশব্দে, বোবাধরা খুনে শূণ্যতায়।
Comments
Post a Comment